অচলায়তনের আঘাতে নিষিদ্ধ (!) সচলায়তন

ফরিদ আহমেদ 

খুব সম্ভবত জনপ্রিয় বাংলা ব্লগ, অনলাইন রাইটার্স ফোরাম সচলায়তনকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোন অফিসিয়াল বক্তব্য পাওয়া যায়নি বাংলাদেশের কোন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার মুখ থেকে। শুধুমাত্র বিডিনিউজ ডট কম এবং প্রথম আলোয় আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে যে, সচলায়তনকে হয়তো বাংলাদেশে ব্যান করা হয়েছে। যদিও সঠিক তথ্য তারাও দিতে পারছে না, দায়িত্বশীল কোন মহল এ বিষয়ে মুখ না খোলার কারনে। কিন্তু ঘটনা পরম্পরায় খুব সহজেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে, আশংকা নয়, সত্যি সত্যি বাংলাদেশে সচলায়তন নিষিদ্ধই হয়েছে। যদি না হয়ে থাকে তবে সেটা হবে খুবই আনন্দের সংবাদ। সচলায়তনের উদ্যোক্তরা তাদের দিক থেকে কোন কারিগরি ত্রুটি খুঁজে না পেলেও কোন এক অজ্ঞাত কারণে শুধুমাত্র বাংলাদেশ থেকে গত তিনদিন ধরে স্বাভাবিকভাবে (বিটিটিবি-র লাইন দিয়ে) সচলায়তনে প্রবেশ করা যাচ্ছে না কিছুতেই। তবে প্রক্সি সাইট ব্যবহার করে চোরাপথে ঠিকই ঢোকা যাচ্ছে সচলায়তনে। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই খুশি হবো যদি জানতে পারি যে, কারিগরি ত্রুটির কারণেই এই সমস্যা হচ্ছে। অন্য কোন কারণে নয়।

সচলায়তনের জন্ম খুব বেশিদিন আগে নয়। মাত্র বছর খানেক হলো এর আগমণ ঘটেছে আন্তর্জালে। কিন্তু এর মধ্যেই দেশে বিদেশে বাংলাভাষী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগিয়েছে এটি। প্রগতিশীল এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিতভাবে বিশ্বাসী একদল প্রবাসী তরুণ তাদের কঠোর পরিশ্রম এবং প্রগাঢ় ভালবাসা দিয়ে গড়ে তুলেছে দারুণ আকর্ষণীয় পরিপাটি ঝকঝকে এই অনলাইন রাইটার্স ফোরামটি। জন্মের পর থেকেই প্রগতিশীলতা আর মুক্ত চিন্তার ধারকবাহক হয়ে উঠেছে সচলায়তন। মৌলবাদ এবং স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকারদের বিপক্ষে সবসময় উচ্চকণ্ঠ থেকেছে সচলায়তন। জলপাই পেষণেও কোন ঘাটতি রাখেনি তারা। সে জন্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গভীরভাবে বিশ্বাসী দেশপ্রেমিক এবং  মুক্ত চিন্তার লোকজনের সমাগম হয়েছে এখানে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। দেশের প্রতি গভীর ভালবাসা থেকে মুক্ত হস্তে লিখে গেছেন তারা দেশের জন্য ক্ষতিকর সমস্ত অন্ধকার শক্তির বিরুদ্ধে। সকল ধরনের অচলায়তনের বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল সচলায়তনের সদস্যরা। আর সে কারণেই হয়তো জল্লাদের খড়গ নেমে এসেছে এত দ্রুত তাদের উপর। বাংলাদেশে যে চিরস্থায়ী অচলায়তনের রাজত্ব গড়ে তুলেছে অশুভ প্রেতাত্মারা। রাজত্ব চিরস্থায়ী হলেও অন্ধকারের শক্তি যে সামান্যতেই ভয় পায়। নিজের ছায়া দেখলেই ভয়ে কুঁকড়ে যায় সে। আর এতো সত্যি সত্যি বিপদ। তারুণ্যের শক্তি যে কত অমিতধর সেটা যে তারা হাড়ে হাড়েই জানে। কাজেই, এই সব মুক্তকণ্ঠ তেজি তরুণদের কন্ঠ রোধ না করা পর্যন্ত তার মনে যে শান্তি নেই। 

মুক্তমনার সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই সচলায়তনের সদস্য। অভিজি, তানবীরা এবং স্নিগ্ধা নিয়মিত সেখানে লেখালেখি করে থাকে। বন্যাও একসময় নিয়মিত লিখেছে সচলায়তনে। ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণেই হয়তো এখন মুক্তমনার মতই অনিয়মিত সেখানেও। আমিও একসময় স্বল্প সময়ের জন্য টুকটাক লিখেছি সচলায়তনে। এ ছাড়াও মুক্তমনার নিয়মিত লেখকদের মধ্যে নুরুজ্জামান মানিক, রণদীপম বসু এবং নন্দিনী হোসেনেরও সরব উপস্থিতি রয়েছে সচলায়তনে। কাজেই সচলায়তনের এই দুর্দিনে আমরাও সমানভাবে ব্যথিত তাদের দূর্দশায়। যে কোন প্রয়োজনে সমমনা এবং কাছাকাছি আদর্শের সচলায়তনের পাশেই থাকবে মুক্তমনা।

এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, মুক্তমনাও তার যাত্রার শুরুর দিকে নিষিদ্ধ হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। নিচের লিংকগুলোতে ক্লিক করলে সেটা দেখতে পাবেন।

https://gold.mukto-mona.com/Articles/avijit/mm_banned_uae.htm

https://gold.mukto-mona.com/Articles/mehul/mm_banned_uae.htm

এখনো সেখানকার লোকজনেরা মুক্তমনা ওয়েবসাইটে যেতে পারেন না। কিন্তু সেই আঘাতে মুক্তমনা দমে যায়নি বিন্দুমাত্র। আমরা আমাদের কাজ করে গিয়েছি নিঃশঙ্ক চিত্তে। তার ফলাফলও পেয়েছি খুব ভালভাবেই। এর প্রমাণ হচ্ছে জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক পাওয়া থেকে শুরু করে দেশে বিদেশে মুক্তমনার অসংখ্য অর্জন। কুপমন্ডুকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে এরকম আঘাত আসবেই। কিছু যে করতে পারছি সেটাই হচ্ছে এর প্রমাণ। যত বেশি আঘাত আসবে তত বেশি বোঝা যাবে যে আমরা আমাদের সঠিক লক্ষ্যের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।

অগণতান্ত্রিক এবং অবৈধ যে কোন সরকারই সবচেয়ে বেশি ভয় পায় গণমাধ্যমকে। কারণ, গণমাধ্যমেরই শক্তি আছে প্রকৃত সত্যকে সকলের সামনে তুলে ধরার। এই জলপাই সরকারও তার ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নিদারুণ ব্যর্থতায়  ছলেবলে কৌশলে যে ক্ষমতা তারা দখল করেছে, তাকে পাকাপোক্ত করার জন্য যা যা করা দরকার তার সবগুলোই করে চলেছে তারা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মিডিয়ার কণ্ঠ রোধ করা। তবে আগেকার স্বৈরশাসকদের মত ঘোষণা দিয়ে মিডিয়ার হত্যা দৃশ্য রচনা করছে না তারা আর। যা করার করছে নীরবে নিভৃতে। অনেকটা পেশাদার মাস্তানদের মত ভূমিকা তাদের। বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোকে টেলিফোনের হুমকির মাধ্যমে স্বেচ্ছা সেন্সরে বাধ্য করেছে তারা। জলপাইয়ের হুমকিতে বাংলাদেশের মিডিয়া এখন ঢোঁড়া সাপ। এ ব্যাপারে যেহেতু সরকারী কোন ঘোষণা নেই সে কারণেই কোন কিছু প্রমাণ করা সম্ভব নয় তাদের বিরুদ্ধে। সচলায়তনের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। পারিপার্শ্বিক বিবেচনায় সবাই জানে নিষিদ্ধ হয়েছে, কিন্তু সেটা প্রমাণ করা যাচ্ছে না কোন অফিসিয়াল ঘোষণা না থাকার কারণে। হুমকি ধামকিতে যেখানে কাজ হয় সেখানে প্রমাণ রাখার দরকারটাই বা কি? বহুত সেয়ানা এবারের এই জলপাই সরকার। সিন্দাবাদের দৈত্যের মত যেভাবে কাধের উপর আয়েস করে জেঁকে বসেছে,  তাতে অনেক অনেক সময় এবং তেল কাঠ পোড়াতে হবে এদেরকে সরাতে সেটা বেশ ভাল করেই বোঝা যাচ্ছে। 

প্রিন্ট মিডিয়া ঢোঁড়া সাপ হওয়ার পরেও ভরসার জায়গা ছিল আন্তর্জালের ব্লগ এবং ওয়েবসাইটগুলো। ভাবা হয়েছিল যে এগুলো মুক্ত এবং স্বাধীন। কিন্তু সচলায়তনের উপর এই চোরাগোপ্তা হামলার পর আর কারো পক্ষেই নিরাপদ ভাবা সম্ভব নয়। আজ সচলায়তন নিষিদ্ধ হয়েছে, কাল অন্য কোন ওয়েবসাইট নিষিদ্ধ হবে। তারপর দিন হয়তো অন্য কেউ। এভাবে ক্রমাগত শক্তি হ্রাস করার চেষ্টা করা হবে শুভ শক্তির। 

আমি মনে করি সচলায়তনের এই দুঃসময়ে অন্যদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে সকল দ্বিধা দ্বন্দ্ব ঝেড়ে মুছে। আন্তর্জালিক যুদ্ধের প্রাথমিক আঘাত এসেছে আমাদের উপর। এ ধরনের আঘাত আরো আসবে। কাজেই তাকে মোকাবেলা করার জন্য দরকার সম্মিলিত শক্তির। সবাই একসাথে কাধে কাধ পেতে দেয়াল তৈরি করলে কোন দানবীয় শক্তিরই সামর্থ নেই সেই দূর্গ ভাঙ্গার। এর প্রমাণতো দেড় যুগ আগেই আমরা একবার পেয়েছি। 

কাজেই আসুন সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ি রাজাকার তোষণে ব্যস্ত মৌলবাদী জলপাই দানবের বিরুদ্ধে। আরো একবার প্রমাণ করি মানুষের মানবীয় শক্তির তেজ দানবের দানবীয় শক্তির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। অচলায়তনের কুসিত কালো দূর্গম দূর্গ গুঁড়িয়ে দিয়ে গড়ে তুলি আলো ঝলমল হাজারো সচলায়তন।

মায়ামি, ফ্লোরিডা                                                                       [email protected]

===============================================

মুক্তমনার মডারেটর, 'মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে' গ্রন্থের লেখক।