নোয়াখালীঃ কল্পলোকের গল্পকথা (৫)

পরশপাথর

সন্ধ্যা হবার সাথে সাথেই এখানকার পল্লীমায়েরা যে জিনিসটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদগ্রীব হয়ে উঠেন সেটা হচ্ছে তার শিশুসন্তানের পড়তে বসা। শিশুরা এখানে স্বাধীন, সত্যিকারের শিশু। শহরের শিশুদের মত প্রাপ্তবয়স্ক নয়। বন্ধের দিনগুলোতে তাদের জোর করে আর্ট কিংবা নাচ-গানের স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয়না; তৃতীয় শ্রেণতেই ভয়েস, ন্যারেশান কিংবা জাতিসংঘের সদর দপ্তর কোথায় সেটা মুখস্ত করতে হয়না। কাজ একটাই, সন্ধ্যা হলে পড়তে বসে যাওয়া। তাদের কোনও গৃহশিক্ষক নেই। কি পড়ছে সেটা দেখারও কেউ নেই। তাই তারা মনের আনন্দে প্রতিদিন ঘুরেফিরে মোটামুটি এক জিনিসই পড়তে থাকে। তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে অথবা বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই। কাজলা দিদি যেন হয়ে ওঠে তাদের আপন মায়ের পেটের বোন। তাদের গলার সমস্ত জোর দিয়ে চিকার করে তারা তাদের মায়েদের বুঝিয়ে দেয় লেখাপড়া করার ক্ষেত্রে তাদের মনযোগের বিন্দুমাত্র অভাবও নেই। 

কিন্তু যে দিনটার কথা এখন লিখছি সেটি অন্য আর পাঁচ-দশটা দিনের থেকে আলাদা। শিশুরা চিকার করে পড়ছে না, ভয়ে চুপ করে আছে। তাদের বাবা-মায়েরা ফিসফিস করে কথা বলছে। তাদের দাদীরা সন্ধ্যা হতে না হতেই জৈনপুরী হুজুরের থেকে ফুঁ দিয়ে আনা তেল মাখিয়ে দিয়েছে তাদের সমস্ত শরীরে। সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে মানা। চারপাশটাতে কেমন জানি একটা বিপদের গন্ধ। পরে অনেক কষ্টে তারা জানতে পেরেছে যে, পাশের ঘরের মেয়েটাকে জ্বীনে ধরেছে। বোকা মেয়েটা, মাগরিবের আজান দেবার পরও খোলাচুলে চালভাজা খেয়ে যাচ্ছিলো উঠোনের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে। জ্বীনে না ধরারতো কোন কারণই নেই। 

কোনও পুরোনো রূপকথা থেকে নয়, লোকমুখে শুনে নয়, আলো-আঁধারির মাঝে আমার অজান্তে ঘটে যাওয়া, আমার চোখকে ফাঁকি দেয়া কোনও ঘটনা থেকেও নয়। নিউটন, আইনস্টাইন, গ্যালিলিও, সক্রেটিসকে আমার তখনও মনে আছে। সৌরজগ, পিরামিড, তাজমহল, আলেকজান্ডারকেও আমার মনে আছে। কিন্তু যে ব্যাখ্যাতীত জিনিস আমি নিজে দেখেছি দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, বিজ্ঞানের কোন সূত্র দিয়ে তাকে আমি ব্যাখ্যা করব সে সূত্র যে আমার মনে নেইনীচের বর্ণনায় সামান্যতম যুক্তি দিয়েও আমি যেটা বাতিল করে দিতে পেরেছি সেটা বাদ দিয়ে যার কোন ব্যাখ্যা আমি দাঁড় করাতে পারিনি সেটুকু তুলে দিলাম।

প্রতিদিন মাগরিবের সময় হলে মেয়েটি দুমুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করতো। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে আস্তে করে কাঁদা। সবাই বুঝতো জ্বীন সওয়ার (ধরার/ভর করার) হবার সময় হয়েছে। মা বাবা তাকে শুইয়ে রাখতো বিছানায়। বাড়ির মানুষজন আসতো দেখতে এবং সাহস দিতে। এরপর মেয়েটি যেন হয়ে যেত অন্য জগতের মানুষ। সবই ঠিক আছে, কিন্তু কথা বলছে একদমই অন্য কেউ একজন। সে নানান রকমের কথা। বাড়ীর লোকজন তাকে জিজ্ঞেস করছে কুশলাদি। সে উত্তর করছে। দুখের কথা হচ্ছে, সুখের কথা হচ্ছে, হচ্ছে আসন্ন বিপদের কথাও। কথা বলছে জ্বীন। কিভাবে কোন মুহূর্তে সে মেয়েটির উপর সওয়ার হোলো তার বর্ণনা দিচ্ছে। তার কয়জন সঙ্গী এখন তাকে পাহার দিচ্ছে তার বর্ণনা দিচ্ছে।  

সে ইচ্ছে মত আসে ইচ্ছে মত যায়। শুধু একটা উপায়ে আটকে রাখা যায় তাকে। একটা উপায়ে দেয়া যায় কষ্ট। বাড়ীর লোকজন লাল মরিচ পুড়িয়ে সামনে নিতে গেলেই প্রচন্ড চিকার। আর কোনোদিনও আসবে না বলে কথা দিয়ে ফেলে। কিন্তু কথা রাখেনা। কারণ মেয়েটিকে ছাড়া সে থাকতে পারছেনা। আর একটা উপায়ে তাকে বেঁধে রাখা যায়। তখন সে চাইলেও ছেড়ে যেতে পারেনা। আমি শুধু দেখলাম, পল্লীর এই মানুষগুলোকে তাদের অসহায় মুহূর্তে সাহায্য করার জন্য কেউ নেই, কিছু নেই। কোন বই নেই, পুস্তক নেই, সমাধান নেই। বাজেট নেই। গবেষণা নেই। যুক্তি আর বিজ্ঞানের যুগের মানুষরা এইসব কাহিনীকে হেসে উড়িয়ে দেবে। কিন্তু সে অসহায় মুহূর্তে মেয়ের বাবা মায়ের চোখে যে অনিশ্চয়তা আমি দেখেছি ভদ্রলোকেরা কোনোদিনও তার সমাধান করতে পারবেনা। অন্য সব বাদ দিয়ে শুধু জ্বীনেধরা মেয়ের বিয়ে দেয়ায় কি সমস্যা হয়, বাংলার সাহিত্যগুলো খুঁজে দেখলেই তার নমুনা খুব সহজে পাওয়া যাবে। 

পল্লীগ্রামের মানুষগুলো নিজেদের প্রয়োজনে তৈরী করেছে সমাধান, বিপদ থেকে বাঁচার উপায়, নিজস্ব বিদ্যা, নিজস্ব বিজ্ঞান। তাদের সেই উপায় নিয়ে সবাই শুধু হাসাহাসিই করেছে কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে সেটাকে মাপেনি কোনদিন। মেডিকেল সায়েন্স, মনোবিজ্ঞান কোন কিছুই দিয়ে কেউ সাহায্য করতে আসেনি। তাই নিরুপায় মানুষগুলো ফিরে যায় তাদের শেষ ঠিকানায়। যুগ যুগ ধরে উপায় না পেয়ে মানুষ যে জিনিসটার কাছে নিজেকে তুলে দিয়েছে, মিথ্যা করে হলেও শুনতে চেয়েছে আশ্বাসের বাণী, ফিরে যায় তারা সে জিনিসের কাছে, ফিরে যায় বিশ্বাসের কাছে। সমাধান হয়ে আসেন মসজিদের ইমাম, মক্তবের মাওলানা, মাদ্রাসার হুজুর। 

মেয়েটির কনিষ্ঠা আঙ্গুলে শক্ত করে গিঁট দিয়ে পরিয়ে রাখা হয়েছে সূতো একজন টান টান করে ধরে রেখেছেন সেটা। একমাত্র এই পদ্ধতিতেই নাকি জ্বীনকে আঁটকে রাখা যায়। ছেড়ে যাবার উপায় নেই। বাড়ী থেকে কয়েকজন গেছেন হুজুরকে ডাকতে। হুজুর আসছে এবং সেটা বলে সবাই ভয় দেখাতে চেষ্টা করছে। হুজুরের কথা বলার পর মেয়েটি দেখি হঠা করে মজার মজার কথা বলতে শুরু করলো। সবাই মনযোগ দিয়ে তার কথা শুনছে। কথা বলতে বলতে একসময় হঠা মেয়েটি হ্যাঁচকা টান দিল তার নিজের হাত দিয়ে। যে লোকটি তার কনিষ্ঠা আঙ্গুল টান টান করে সূতো দিয়ে বেঁধে ধরেছিলো তার হাত থেকে সূতো চলে গেল, ধরে থাকতে পারলনা লোকটি। এরপর যে দুটো জিনিস আমি দেখতে পেলাম সারা জীবনেও সেটা ভুলতে পারা আমার পক্ষে অসম্ভব। প্রথমত, সাথেই সাথেই মেয়েটি বলছে,আমার কি হয়েছে? এত লোকজন কেন? আমি এখানে কেন? দ্বিতীয়ত, সাথে সাথেই বাড়ীর সমস্ত কুকুরগুলো পাগলের মত চিকার শুরু করলো এবং বেঁধে রাখা গবাদি পশুগুলো প্রাণপনে চিকার করতে লাগলো। না, আমার মতিভ্রম হয়নি, আমি ঘটনার আকস্মিকতায় বিহবলও হয়ে যাইনি। পুরো জিনিসটাই আমি পর্যবেক্ষণ করেছি সপ্তাহজুড়ে। প্রতিদিন এ ছেড়ে যাওয়ার সময় আমি শুনেছি কুকুরের চিকার, বাড়ীর টিনের কাঁপন। শুধু মেয়েটি আর বলতনা, আমার কি হয়েছে, আমি এখানে কেন? কারণ ততদিনে সে বুঝে ফেলেছে তার এই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার কথা, অভ্যস্ত হয়ে গেছে এক ব্যাখ্যাতীত বাস্তবতার।  

বেশকিছুদিন এভাবে চলতে থাকার পর এবং সাথে সাথে ডাক্তারী ঔষধ সেবনের পরও কোনওরকমের কুলকিনারা হচ্ছিলো না। উল্লেখ্য, ইমাম সাহেব এবং মক্তব-মাদ্রাসার হুজুররা  আগেই ব্যর্থ হয়েছেন এবং সমাধান স্বরূপ তারা বলে দিয়েছে এ এক সাংঘাতিক জ্বীন, নিজে না ছেড়ে গেলে আমাদের সাধ্য নেই। অন্যদিকে, সময়  মেয়েটির উপর জ্বীন ভর করে থাকলেও ঠিক কথা বলেনা। কিন্তু সারারাত জুড়ে মেয়েটি ঘুমোতে পারেনা। শুধু কাতর স্বরে আর্তনাদ করতে থাকে। বড় দুঃসহ সেই যন্ত্রণা। বাবা মায়ের জন্য, পরিবারের জন্য এক কষ্টকর অভিজ্ঞতা। কিন্তু একসময় সমাধান হয়েছিলো ঠিকই। এবার সেই সমাধানের গল্পটা একটু বলি। 

এই মেয়েটির সমস্যা সমাধানের জন্য যে হিন্দু লোকটি এসেছে তিনি খালি গায়ে আছেন। প্রথমেই এসে গ্লাসের মধ্যে একগ্লাস পানি নিলেন। নিজে নিজে আরো কি কি সব বললেন, করলেন। সঙ্গে তিনজন লোক থাকতে বললেন। আর বললেন তাবিজ যদি পুকুরের মাঝে মাছের গলায় লাগিয়ে দেয়া হয় তাহলে সেখান থেকে গিয়ে হলেও আমাকে নিয়ে আসতে হবে। এতে আমার মৃত্যু হলেও কিছু করার নেই। নোয়াখালী অঞ্চলে এই তাবিজ করাকে সাধারণত বলা হয় নষ্ট করা। স্থানীয়রা বলে কুফরী কালাম দিয়ে এই ধরণের তাবিজ বা নষ্ট করা হয়ে থাকে। এর কতটুকু আমি নিজে বিশ্বাস করছি বা করিনি সেটা আমি বলছিনা, আমি শুধু আমার নিজের চোখে দেখা জিনিস তুলে ধরছি। 

কিছুক্ষণ পর শুরু হল সেই আজব ঘটনার আদিপর্ব। যদি সাজানো নাটকও হয়ে থাকে তবে আমি নির্দ্বধায় বলতে পারি, এর থেকে সফল নাটকের মঞ্চায়ন এই পৃথিবীতে কোন প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যকারের পক্ষে করা অসম্ভব। লোকটা যেন এক অন্য মানুষ হয়ে গেল, তারপর দৌঁড়াতে থাকলো। পরনে শুধু একটা লুঙ্গি, শক্ত করে বাঁধা। পিছনে তিনজন তার সাথে সাথে দৌঁড়াচ্ছে। প্রথমে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে গিয়ে উপস্থিত হল ঘরের সামনের রাস্তার মাথায়। হাত দিয়ে, নখ দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। সাথের তিনজন সাথে সাথে শাবল দিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করল এবং গর্ত থেকে বের করে আনল পুরোনো, মাটিতে লেগে শক্ত হয়ে থাকা তাবিজ। লোকটি ঘামছে, আবার দৌঁড়াছে। পিছনে আছে তিনজন যারা মেয়েটির আত্মীয়-স্বজন। একটু পরে লোকটি ঘরে ঢুকে পড়ল, বিছানার বালিশ বের করে ছিঁড়ে ফেলতে চাইল। সাথের লোকগুলি এসে ছুরি দিয়ে বালিশ কাটল। বালিশের তুলোর মাঝখান থেকে বেরিয়ে আসল তাবিজ। বিস্ময়ে আমার প্রায় পাগল হয়ে যাবার দশা। আমি খুঁজে ফিরছি, কোথায় সেই ফাঁক আর কোথায় সেই টেকনিক, রাতের বেলাতে এসে তাবিজ রেখে যায়নিতো? এরকম নানবিধ প্রশ্ন জীবিকার তাগিদে মানুষ কত কিছুইতো করে। কিন্তু অবাক হয়ে গেলাম যখন দেখলাম সে লোকটি পারিশ্রমিক নেবেনা।  

আমি যখন অবাক হয়ে সমস্ত জিনিসের ব্যাখ্যা খুঁজতে হয়রান, তখন এখানকার মানুষগুলো দিব্যি মনের আনন্দে নিজের কাজকর্মে মনযোগ দিতে শুরু করেছে। তাদের হাব ভাব দেখে মনে হলো এতো খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। কেউ শত্রুতা করে তাবিজ করেছে, উনি এসে তুলে দিয়ে গেছেন। এতে অবাক হবার কি আছে? আমাকে ক্ষমা করবেন, আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক দিয়ে এর থেকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। আমি শুধু অপার বিস্ময় নিয়ে সেই রাতে সেই মেয়েকে সম্পুর্ণ সুস্থ দেখেছিলাম। দেখেছিলাম অনেক দিন পর সে ঘুমোচ্ছে পরম শান্তিতে, আর দেখেছিলাম তার বাবা মায়ের মুখে স্বস্তির, শ্রান্তির এক পরম তৃপ্তিময় ছায়া।

এই কাহিনী লেখার আগে আমি অনেক বার চিন্তা করেছি লেখা উচি কিনা। ব্যক্তিগতভাবে কারো থেকে শুনে থাকলে এ কাহিনী আমি বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু যে জিনিস আমি নিজের চোখের সামনে দেখেছি, ব্যাখ্যার অভাবে তা গোপন করাটা আমার কাছে প্রতারণা মনে হচ্ছিলো। আমি এখনো মনে করি, কোন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা এর আছে। আমি জাদুকরের জাদু দেখেও বিস্ময়াপন্ন হয়ে যাই। তার মানেতো এই নয় যে তার ব্যাখ্যা নেই। এই ঘটনাগুলোর কোনো ব্যাখ্যাও নিশ্চয়ই আছে। হয়তো আমার চিন্তার বাইরে। আমি সে ব্যাখ্যার আশায় থাকলাম।

আমার উপরের দেয়া বর্ণনা কিছু দিন আগের, পুরোনো কাহিনী। কিন্তু এই ঘটনা গুলিকে পুঁজি করেই এখানে আবার গড়ে উঠেছে ব্যবসা। সে জীবনের অন্য আরেক দিক। ফেনীর গেদু ঠাকুর বা উদিলা ঠাকুরের আস্তানা আপনাকে চিনতে হবেনা। সম্ভবত খালি গায়ে থাকেন বলে তার নাম উদিলা ঠাকুর। ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়কে মহিপাল নেমে রিক্সাওয়ালাকে বললেই হবে। আমি নিজে যদিও এই জায়গাটাতে যাইনি। কিন্তু সেখানে প্রতিদিন লাইন ধরে যে মানুষ গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে গল্প আমি শুনেছি। মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে কারণ মানুষ নাকি সুস্থ হয়, নিশ্চি করে সুস্থ হয়। তাকে একনামে চেনে এখানকার চারপাশের বিশাল এলাকার মানুষ। ফেনীর কেউ জেনে থাকলে হয়তো তথ্য দিয়ে আমাদের সাহায্য করতে পারেন। 

গেদু ঠাকুরের মত বিখ্যাত নয়, কিন্তু জ্বীন ডাকতে পারে এরকম একটি জায়গায় আমি গিয়েছিলাম নতুন করে। মাত্র এক সপ্তাহ আগে। যে মহিলা জ্বীন ডাকতে পারেন তার কাছেই গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে আমি দেখেছি মহিলা এক মিনিটের মধ্যেই জ্বীন ডেকে নিয়ে আসেন। তার কাছে এসে বসে আছে বোরখা পরিহিতা অনেক মক্কেল। সৌভাগ্যবশত যে মহিলা জ্বীন ডাকেন, তিনি বোরখা পরেন না, পুরুষ মানুষ দেখে পালিয়ে বেড়ান না। তা না হলে হয়তো আমার কথা বলাই হতো না। পঞ্চাশ টাকা চালের কেজির বাজারেও উনার ভিজিট মাত্র দশ টাকা। তার জ্বীন ডাকার কিছু ছবি আমার মোবাইল সেটে তুলেছিলাম। কিন্তু সমস্ত প্রক্রিয়ার পুরো জিনিসটাই পুর্বপরিকল্পিত আর সজ্জিত, সেটা বুঝতে আমার বাকী রইলো না। তাই সে কাহিনী লিখে লেখার পরিধি আর বাড়াতে চাইনা। কিন্তু আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম তার আয়োজন দেখে। কি বিপুল আয়োজন আর আত্মবিশ্বাসের অভিনয় দিয়ে জীবন চালিয়ে নিচ্ছে এই শিল্পী। আমি জ্বীন দেখতে যাইনি, জীবিকার তাগিদে মানুষ ব্যাখ্যাতীত জিনিসগুলোকে পুঁজি করে কিভাবে জীবন সংগ্রাম করে চলেছে সেই উপাখ্যান দেখতে গিয়েছিলাম। মানুষ ঠকানোর অজুহাতে সেই মহিলার প্রতি আমার ঘৃণা জন্মায়নি, এর থেকে কত বড় বড় ঠকাবাজরা চালায় দেশ, চালায় বিশ্ব। বরং, সে মহিলার বাড়ি থেকে আমি ফিরে এসেছিলাম মুগ্ধতা নিয়ে, তার শিল্পমানসের পরিচয় নিয়ে। ফেরার সময় বারবার আমার কানে শুধু একটা কথাই বাজতে থাকল, বড় বিচিত্র এই দেশ,  তার চেয়েও বিচিত্র এ দেশের মানুষগুলো।

 

[email protected]

March 17, 2008