সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি ও আমাদের আশা

রিফা আরা

আমাদের বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এপর্যন্ত যত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তাদের বেশির ভাগই হয়েছে খুব গোপনে। ঠিক কী কারণে এরকম গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয় আমরা জানি না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে কোন মুক্ত আলোচনা নেই, পূর্বপ্রস্তুতি নেই, কারা কারা মিলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সে বিষয়ে কোন সুস্পষ্ট তথ্য নেই - একদিন হঠা করে ঘোষণা করা হয় যে অমুক তারিখ বা অমুক সাল থেকে এই এই ব্যবস্থা চলবে। মাঝে মাঝে সিদ্ধান্তগুলো এতটাই আত্মঘাতী হয় যে অনেক আন্দোলন করে সে সিদ্ধান্ত বাতিল বা স্থগিত করাতে হয়। উদাহরণ হিসেবে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলা যায়। এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তটি চাপিয়ে দেয়ার সবরকম ব্যবস্থা গোপনে করে ফেলার পর তা জাতিকে জানানো হয়। প্রফেসর জাফর ইকবাল সহ আরো অনেকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে এসেছিলেন বলেই একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা ঠেকানো সম্ভব হয়েছে।          

এরপর কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন পদ্ধতিতে ২০১০ সালের এস এস সি পরীক্ষা নেয়ার ঘোষণা দেয়া হলো। পদ্ধতিটি যে আসলে ভালো একটি পদ্ধতি এবং তা সঠিকভাবে প্রচলন করা হলে যে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি চমকার আকাঙ্খিত পরিবর্তন আসবে তা বুঝতে পারলাম  প্রফেসর জাফর ইকবালের লেখা কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নঃ আশা ও আশঙ্কা পড়ে [প্রথম আলো, ৪ এপ্রিল ২০০৮] । এত চমকার একটি ব্যাপার ঘটাতে চাচ্ছেন বাংলাদেশের শিক্ষা বিষয়ক কর্মকর্তারা, কিন্তু এত গোপনে কেন? এত তড়িঘড়ি করে কেন? প্রফেসর জাফর ইকবালের লেখাটা পড়ার  আগ পর্যন্ত ভালো করে জানতেই পারিনি যে এরকম একটা ব্যাপার ঘটতে যাচ্ছে। কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য জানতে স্বয়ং জাফর ইকবালকেই কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রণালয়ে ফোনের পর ফোন করেও কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। এতবড় একটা প্রকল্পের কোন ওয়েবসাইট নেই। অথচ কয়েক শ কোটি টাকা খরচ করে আমাদের জন্য সাবমেরিন কেবল সংযোগ নেয়া হলো। কতৃপক্ষের এলোমেলো ব্যবস্থার কথা জানতে পেরে কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন পদ্ধতির পরীক্ষার ব্যাপারে যতটা আশান্বিত হয়েছি, তার চেয়েও বেশি হয়েছি আশঙ্কিত।

         

আশঙ্কিত হবার কারণ অনেক। প্রথমতঃ সরকারের শিক্ষা বিভাগ কোন দিক নির্দেশনা ছাড়াই কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন পদ্ধতি সম্পন্ন পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করে ২০১০ সালের এস এস সি পরীক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। কারণ পাঠ্যবইগুলোতে এ বিষয়ে কোন আলোচনা বা দৃষ্টান্তমূলক প্রশ্ন নেই। যার কারণে শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকদের কাছেও বিষয়টি এখনো  যথেষ্ট পরিষ্কার বোধগম্য নয়। দ্বিতীয়তঃ শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়েছে জানুয়ারি থেকে। কিন্তু এপ্রিল মাসেও বেশির ভাগ স্কুলের শিক্ষকদের এ বিষয়ে প্রাথমিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়নি। অথচ অধিকাংশ স্কুলে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। এর ফলে শিক্ষক ছাত্র যেমন পাঠদান ও গ্রহণের ক্ষেত্রে সমস্যায় আছে, তেমনি অভিভাবকরাও সন্তানের ভবিষ্য নিয়ে চিন্তিত।

         

আমরা জানি বীজ বোণার আগে ভূমি তৈরি করতে হয়। ঠিক তেমনি নতুন কোন পদ্ধতি প্রবর্তনের আগে - বিশেষ করে শিক্ষার মত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে - তার ভাল-মন্দ, গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি যাচাই এবং সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে প্রচুর জনসচেতনতামূলক প্রচার প্রয়োজন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় এ বিষয়ে কোন পরিকল্পিত পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই শিক্ষা কতৃপক্ষ বিষয়টি চালু করে দিতে চেয়েছেন। যার ফলে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা বিকাশের সম্ভাবনাময় এ পদ্ধতি হয়তো শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়বে। কারণ ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে যে ছাত্র-শিক্ষক অভিভাবকদের মত সরকারও এ পদ্ধতির প্রয়োগ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। কোন কোন স্কুলে কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন প্রণয়ন করা শুরু হয়েছে, আবার বেশির ভাগ স্কুলে এ সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই কারো। আবার কোথাও কোথাও ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে এ পদ্ধতিতে লেখাপড়া এবং পরীক্ষা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এর ফলে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে একটি বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হতে চলেছে। মাঝখান থেকে লাভবান হচ্ছে গাইড বই প্রকাশকরা। হতবিহ্বল শিক্ষার্থী ও অভিভাবকবৃন্দ বাজার চষে একাধিক গাইড বই কিনে সেগুলোর উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন।

 

এরকম বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো ২০১০ সালের এস এস সি পরীক্ষা কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নে হবে কিনা তা ৩১ মার্চের মধ্যে জানানো হবে। কিন্তু সার্বিক প্রস্তুতি ছাড়া হঠা চালু করে দিয়ে পুরো প্রকল্পটিকে একটি ভুল প্রকল্পে পরিণত করার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সোচচার হলেন প্রফেসর জাফর ইকবাল, আবদুল্লাহ আবু সাঈদ সহ আরো অনেক সচেতন শিক্ষাবিদ অভিভাবক। আমাদের সৌভাগ্য যে শেষপর্যন্ত সরকারের বোধোদয় হয়েছে। ১৫ এপ্রিল ঢাকার বিয়াম মিলনায়তনে কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন পদ্ধতির ব্যাপারে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রফেসর মনিরুজ্জামান মিয়া, প্রফেসর জাফর ইকবাল, প্রফেসর আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ সহ সাতজনের একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়। এ কাজটি প্রকল্পের শুরুতে করলে সরকারকে এত লেজেগোবরে হতে হতো না এ ব্যাপারে। তবুও সরকারকে সাধুবাদ এই কারণে যে দেরিতে হলেও তাঁরা ব্যাপারটি বুঝতে পেরেছেন খুব বেশি দেরি হবার আগেই।

         

২৪ এপ্রিল সুপারিশ কমিটি তাঁদের সুপারিশগুলো প্রকাশ করেছেন। ২০০৯ সাল থেকে ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণীতে পূর্ণাঙ্গ সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি চালু হবে। কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন পদ্ধতির নাম বদলে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি করার সুপারিশ করা হয়েছে - যা সত্যিকারের সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে। ২০১০ সাল থেকে শুধু বাংলা প্রথম পত্র ও ধর্ম শিক্ষা বিষয়ে এবং ২০১১ সাল থেকে সকল বিষয়ে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিতে এস এস সি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। সুপারিশ কমিটিকে আন্তরিক সাধুবাদ জানাচ্ছি তাঁদের দূরদর্শী ও সময়োপযোগী সঠিক সুপারিশ দ্রুত পেশ করার জন্য। তাঁদের এ সুপারিগুলো বাস্তবায়িত হলে আমাদের শিক্ষার্থীরা নতুন এবং যুগোপযোগী এ পদ্ধতিটির সঙ্গে ধাপে ধাপে নিজেদের অভিযোজিত করে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারবে। আমরা আশা করবো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সুবাতাস বইয়ে দেবার সম্ভাবনাময় এ সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি সবার সহযোগিতায় সত্যিই সফল হবে। আমাদের মুখ থুপড়ে পড়া শিক্ষাব্যবস্থা একটু একটু করে আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে নতুন  সৃজনশীলতায়।

 

রিফা আরা। চট্টগ্রাম শাহীন কলেজের বাংলার অধ্যাপক।