অন্তর্ঘাত

(রাজনৈতিক উপন্যাস)

আবুল হোসেন খোকন 

[ সত্তর দশক বিশেষ করে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে সামরিক শাসনের পটভূমিকে ভিত্তি করে এই রাজনৈতিক উপন্যাসটির অবতারণা অপ্রকাশিত এ পাণ্ডুলিপির অংশবিশেষ ধারাবাহিকভাবে মুক্তমনায় তুলে ধরা হলো লেখক

পার্ট - ৬

নগরবাড়ি ঘাটপ্রবেশ মুখে বিরাট আকারের আর্মি চেকপোস্টবালুর বস্তা সাজিয়ে বেশ কয়েকটি নিরাপত্তা পোস্ট বসানো হয়েছেতাতে পাতা রয়েছে ভারী ও হালকা মেশিনগান ব্যারিয়ারের সামনে বিনুদের বাস থেমে দাঁড়ালোউঠে এলো হেলমেট পড়া টমিগান হাতে কয়েকজন আর্মিসকল যাত্রীকে নামার ইঙ্গিত করা হলো নিঃশব্দে আদেশ পালন করলো সবাইবিনুও বাইরে এসে লাইন করে দাঁড়ালোভিতরে ভিতরে ঘামছে ও আর্মিদের একটা দল জিজ্ঞাসাবাদসহ দেহতল্লাশী করলোআর কয়েকজন বাসের ভিতরে যাত্রীদের ব্যাগ ও অন্যান্য জিনিসিপত্র তন্নতন্ন করে হাতরালোতেমন কোন কিছুই পেলো না ওরাতবে লাইনে দাঁড়ানো এক তরুণ সমস্যা তৈরি করে ফেলেছেঢাকার কোন কলেজের ছাত্রমাথার চুল বেশ বড়গায়ে রঙচঙে সার্টহাতে বালা, গলায় চেন আর্মিরা তরুণটিকে ছেঁকে ধরেছে রাজনীতি করে কিনা, মাস্তান কিনা, গলায় মালা কেন, চুল বড় কেন ইত্যাদি নানান প্রশ্নে জর্জরিত করে ফেলেছেক্রমেই উত্তেজিত হয়ে উঠছে প্রশ্নকারীরাএক পর্যায়ে চুলের মুঠি ধরলো এক আর্মিআরেকজন সবুট লাথি হাঁকলো পাঁজর বরাবরহ্যাঁক শব্দ করে কুকড়ে গেল তরুণতারপর ওকে চেকপোস্টের পাশে ক্যাম্পের দিকে নিয়ে যাওয়া হলোবাকি যাত্রীদের বাসে উঠতে বলা হলোবাস আবার চলতে থাকলো

ঘাট পর্যন্ত এক কিলোমিটারের কম রাস্তা পেরুতে আরো তিন জায়গায় আর্মি চেক হলোসবগুলো বাধা পেরিয়ে তবেই বাস ঘাটে ভিড়লোভিতরে ভিতরে শুকিয়ে আমচুর হয়ে গিয়েছিল বিনুএখন খানিকটা হাঁপ ছাড়লোবাস থেকে নেমে ফেরীর দিকে না গিয়ে লঞ্চের দিকে এগুলোফেরীতে আর্মি থাকার সম্ভাবনা আছেএকটা লঞ্চ এখনই ছেড়ে দেবে হাঁকডাক করছেবিনু উঠে পড়লো তাতেকিন্তু যেখানেই বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়লঞ্চে আর্মি না থাকলেও সশস্ত্র পুলিশ ও আনসার রয়েছেঅবশ্য আর্মির মতো এরা অতো বিপদজনক নয়বিনু ওপরতলার দিকে না গিয়ে নিচতলায় ঢুকে পড়লোফাঁকা একটা আসন দেখে এগিয়ে গেলআসনটা পছন্দসই জানালার ধারেবিপদ দেখলে লাফিয়ে পানিতে ঝাঁপ দেওয়া যাবেবসে পড়লো বিনু কিছুক্ষণ পর চলতে শুরু করলো লঞ্চ ব্যাগটা কোলের উপর রেখে ঝিমুনির ভাব টেনে আনলো ও

ঢাকায় অনেকগুলো কারণে যেতে হচ্ছে বিনুকে পার্টিতে নানান প্রশ্ন জমে উঠেছেএকদিকে সরকারি বাহিনীর বর্বর দমননীতি, আরেকদিকে সিওসি (অর্গানাইজেশন অব সেণ্ট্রাল কমান্ড)-এর যোগসূত্রহীন সিদ্ধান্ত নিয়ে পার্টি-সংগঠনে এই বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছেএসব বিষয় নিয়ে আঞ্চলিক সমন্বয় কমিটির বৈঠক হয়েছেবৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারেই সিওসির কাছে যাচ্ছে বিনু

সমন্বয় কমিটির বৈঠকে অনেক প্রশ্ন উঠেছিলকেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছে, বার বার সিওসি থেকে বলা হচ্ছে শীঘ্রই সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থান শুরু হচ্ছে অভ্যুত্থানটা শুরু হবে সামরিক বাহিনী থেকেতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে গণসংগঠনগুলোসহ গণবাহিনীকেজিরো আওয়ারে ঘটনা ঘটবে দিন-তারিখটা যে কোন সময় জানিয়ে দেওয়া হবেএই মৌখিক সংকেতটাকে একইভাবে দেওয়া হচ্ছে মাসের পর মাস ধরেকিন্তু সংকেতের দিন-তারিখ আসছে নাপার্টি সার্কুলারগুলোতে বলা হচ্ছে, দেশে বিপ¬বী পরিস্থিতি বিরাজ করছে, অকল্পনীয় গতিতে ভিতরে ভিতরে গুণগত পরিবর্তন ঘটছেএখন শুধু বিস্ফোরনের অপেক্ষাসেই অপেক্ষায়ই দিন গুনছে পার্টি-সংগঠকরাএদিকে একটি সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন মহান বিপ¬বী কর্নেল আবু তাহের (বীর উত্তম)সিওসি এবং পলিটব্যুরোর ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এই অবস্থাপ্রশ্ন উঠেছে, জিয়াউর রহমানের মতো একজন প্রতিক্রিয়াশীল সামরিক অফিসারকে কেন বিশ্বাস করা হয়েছিল? কেন কর্নেল তাহের তার প্রাণ বাঁচালেন, তাকে নবজীবন দান করলেন? সেই জিয়াউর রহমান কি আজ কর্নেল তাহেরকে বাঁচাবে? যদি বাঁচাতোই, তাহলে অন্ধ কারা প্রকোষ্ঠে প্রহসনের বিচার শুরু করতো নাজিয়াউর রহমান যদি মানবপ্রেমিক ও দেশপ্রেমিক হতোÑ তাহলে প্রতিদিন সেনাবাহিনীতে শুদ্ধি অভিযানের নামে শত শত মুক্তিযোদ্ধা সৈনিককে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে অথবা রাতের আঁধারে কারাগারের ভেতর ফাঁসী দিয়ে হত্যা করতো নাজনগণ, গণবাহিনী এবং গণসংগঠনগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য সারাদেশে হত্যা ও দমননীতি চালাতো নাএই ধরনের এক গণবিরোধী সামরিক অফিসারের সঙ্গে পার্টি নেতৃত্ব কেন বন্ধুত্ব করতে সায় দিয়েছিল? কেনই বা কর্নেল তাহেরকে ৭ নভেম্বরে বেতার-টিভিতে সিপাহী বিপ¬বের নেতৃত্বদানের কথা বলতে দেওয়া হলো না? কেন তাঁর বদলে জিয়াউর রহমানকে কথা বলতে দেওয়া হলো? এখন বলা হচ্ছে, জিয়াউর রহমান সাম্রাজ্যবাদের দালাল ছিলপার্টি নেতৃত্ব কেন এটা আগে জানেনি? তারপর আরো প্রশ্ন উঠেছেপ্রশ্ন উঠেছে ৭ নভেম্বর ভোরে সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থান ঘোষণা করা হলো, বেতার-টিভিতে গণবাহিনী, জাসদ আর বিপ¬বী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্ব দানের কথা বলা হলোকিন্তু এই অভ্যুত্থান করার আগে কেন পার্টি চ্যানেলগুলোতে জানানো হলো না? কেন সময়মতো সারাদেশের সমন্বয় কমিটিগুলো কিছু জানলো না? এটা কি হটকারী নয়? কেন, কার স্বার্থে এই হটকারীতা?

আরো বহু প্রশ্ন উঠেছিল বৈঠকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং সিওসির অবস্থান সম্পর্কেও কথা উঠেছিলবলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ পেটি-বুর্জোয়া দল, সে কখনই সর্বহারা শ্রেণীর বিপ¬বের মিত্র হতে পারে নাতাই সে আমাদের শত্রকিন্তু যে শ্রেণী চরিত্রের কথা বলে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে এবং সেই সঙ্গে চালানো হচ্ছে খতম অভিযান সেখানে আমাদের দলীয় চরিত্র কি? একদিকে পার্টি সার্কুলারগুলোতে বলা হচ্ছে আমাদের দল পেটি-বুর্জোয়াদের নিয়ে, আমরা একে সর্বহারা শ্রেণীর দলে পরিণত করার প্রক্রিয়ায় আছিভাল কথা, এটা তো অনেক দিন থেকেই বলা হচ্ছেকিন্তু আজো পর্যন্ত সর্বহারা শ্রেণীর পার্টি কমিউনিস্ট পার্টি গড়া হয়নিঅথচ আমরা কমিউনিস্ট পার্টির মতো সামরিক সংগঠন গড়েছি, পলিটব্যুরো করেছি, কিন্তু পেটি-বুর্জোয়া চরিত্রের বিলুপ্তি ঘটাইনি! এই প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ কতোটুকু যুক্তিযুক্ত? তাছাড়া একদিকে সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, একইসঙ্গে রাজনৈতিক ভিত্তিধর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লড়াই কতোটুকু সঠিক? শুধু তাই-ই নয়, অন্যান্য সকল বামপন্থী নামধারীদলগুলোর সঙ্গেও আমাদের সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছেযদিও সবাই আমরা সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার জন্য লড়ছি মতাদর্শগত বিরোধ বা পার্টি লাইনগত মতভেদ আছে বলেই কিÑ এখানে সশস্ত্র লড়াই অনিবার্য? এখানে কি মতাদর্শগত সংগ্রাম কাম্য ছিল না? অথচ একা সমস্ত শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে আমরা অবিরাম শক্তিক্ষয় করছি দমননীতির মুখে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছিপাল্টা কিছুই করতে পারছি না অন্যদিকে এই সুযোগে বামপন্থীদের চরম শত্র মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠছেশক্তি বৃদ্ধি করছে

বৈঠকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ব্যাপার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে সাংগঠনিকভাবে আমাদের এই জায়গাটা একেবারেই অস্পষ্টকেন? প্রথমে আমরা বললাম, রুশ-ভারত আমাদের এক নম্বর শত্রপরে এই তালিকায় যোগ করলাম মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নামকেন এই বিলম্ব? আর কেনই বা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে এক নম্বর শত্রহিসেবে দেখছি না? প্রথমে আমরা বলেছিলাম চীন এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টি আমাদের মিত্রএখন বলছি, ওরা স্ট্যালিনের আদর্শচ্যুত, সুতরাং ওরা আমাদের মিত্র নয়কখনও বলছি, আলবেনীয় কমিউনিস্ট সরকার আমাদের মিত্র, আবার যোগাযোগ রক্ষা করছি ভারতের সোসালিস্ট ইউনিটি সেণ্টারের (এসইউসি) সঙ্গেএসইউসির প্রধান কমরেড শিবদাস ঘোষের থিসিসের হুবহু অনুলিপি তৈরি করে আমাদের পার্টি থিসিস করেছি! কেন? আবার কখনও বলছি, উত্তর কোরিয়া আমাদের মিত্র, কিন্তু বাস্তবে এই মিত্রতার কোন প্রমাণ নেইতাহলে আন্তর্জাতিকভাবে কে আমাদের মিত্র, আর কে-ই বা শত্র“? এগুলো এতো অস্পষ্ট থাকার কারণ কি??

বিনুর কাছে অনেক সময় সবকিছু গোলমেলে মনে হয়যদিও সব প্রশ্নের সঙ্গে ও একমত নয়ওরও রয়েছে নতুন নতুন বহু প্রশ্নভাবতে গিয়ে কখনও কখনও  অবাক হয়ে যায় ওযেদিন দেশের একমাত্র দল আওয়ামী লীগ ভেঙে ওদের  দলটা তৈরি হলো, সেদিন থেকে দেশে এক নতুন অবস্থা তৈরি হলো ক্ষমতাসীনদের বিকল্প হয়ে দাঁড়ালো ওর দলকতো মানুষ যুক্ত হলো এই দলে! পল্টনের মাঠে যখন জনসমাবেশ ডাকা হতো, তখন লাখ লাখ লোক সমবেত হতো বক্তৃতা শোনার জন্য৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর পল্টন ময়দানে আর এতো বড় সমাবেশ আওয়ামী লীগও করতে পারেনিজন্মের সঙ্গে সঙ্গেই এতো জনপ্রিয় সংগঠনে পরিণত হয়েছিল বিনুদের গণসংগঠন দেশবাসীর আশা-ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছিল নেতাদের বক্তৃতায় গণমানুষের মন-মানসিকতা যখন টগবগ করে ফুটছিল তখন দলে দলে যুবক-তরুণ-ছাত্র-ছাত্রী আর মুক্তিযোদ্ধারা এই দলে সমেবত হচ্ছিলোসত্যিই একটা পরিবর্তনমুখী শক্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছিল দলকিন্তু তারপর এমন সব ঘটনা ঘটলো যা ভাবা যায়নিদলের উপর এমন ভয়াবহ দমননীতি নেমে এলো যে, দলের সবাই আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে গেল গণসংগঠনগুলোর তপরতা বন্ধ হয়ে গেলএরপর ১৫ আগস্টে হঠা স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলো একদল সামরিক বাহিনীর লোক ক্ষমতাচ্যুত হলো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলো কট্টর ডানপন্থী চক্রতারপর আরো কিছু ঘটনা ঘটলো ক্ষমতায় এলো জিয়াউর রহমান ইতিহাসের নজীরবিহীন দমননীতি নেমে এলো বিনুদের উপর বিনুদের দলে বিপ¬বী মন্ত্রণায় দীক্ষিত হয়ে এতো তরতাজা তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, ছাত্র-ছাত্রী, কিশোর, শ্রমিক, কৃষক সমবেত হয়েছিল যে পৃথিবীর কোন বামপন্থী সংগঠনে এতো দ্রুত এতো শক্তিভিত কখনও গড়ে ওঠেনিকিন্তু দমননীতির মুখে আজ পরিস্থিতি অন্যরকমদলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই এখন কঠিনযদিও আন্ডারগ্রাউন্ড শক্তিভিত এখনও অকল্পনীয়তবুও আগের মতো সেই গণভিত্তি আর আছে বলে মনে হয় নাহয়তো গণসংগঠনগুলোর অনুপস্থিতিই এর কারণহয়তো দমননীতির মুখে জনগণের ভিতরে আতঙ্ক ঢুকে যাওয়াও একটা কারণফলে পার্টি-সংগঠনে প্রায়ই দেখা দিচ্ছে হতাশাঅবশ্য সিওসির গণঅভ্যুত্থান সংক্রান্ত মেসেজ এখনও আশাবাদী করে রেখেছে অনেককে

অতীতের অনেক ঘটনার জন্য কাকে দায়ী করা যেতে পারে ভেবে পাচ্ছে না বিনুদলে একজন রহস্যময় ব্যক্তিত্ব রয়েছেনতিনি হলেন দাদাপার্টি প্রক্রিয়া বা সাংগঠনিক দলিলপত্রে বার বার বলা হচ্ছে পার্টি চলবে যৌথ নেতৃত্বে এবং যৌথ সিদ্ধান্তেকিন্তু বার বার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে সবকিছু চলছে এক ব্যক্তির ইচ্ছায়সেই ব্যক্তি হচ্ছেন দাদা পলিটব্যুরো বা সিওসি কিছুই জানে না, অথচ দাদার নির্দেশে অনেক কিছু ঘটছে পলিটব্যুরো বা সিওসির বাইরে দাদাই সবকিছু দেখছেন, করছেন; এবং নির্দেশ দিচ্ছেনদলের চেইন অব কমান্ডও তার হাতেঅথচ কাগজে-কলমে এসবের কোন অস্তিত্ব নেই কাগজে-কলমে সিওসি বা পলিটব্যুরোই সবমাঝে মাঝে বিনুর মনে হয় পার্টির কোন সিদ্ধান্তই যৌথ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নয়এসব সিদ্ধান্ত কোন না কোন ব্যক্তিরজটিল এইসব বিষয়ে প্রশ্ন করে কোন সদুত্তর পাওয়া যায় নাশুধু অস্পষ্টতা তাই বাড়েসব মিলিয়ে অনেকের মতো বিনুর কাছেও মনে হয় দাদাসত্যিই রহস্য পুরুষ! কিন্তু কোন বামপন্থী সংগঠনে এ ধরনের রহস্যময়তার অবকাশ আছে বলে বিনুর জানা নেইশোনা যায় কর্নেল তাহেরকে নাকি তিনিই ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে বলেছিলেনযে তাহের আজীবন একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার জন্য সেনাবাহিনীকে জনগণের বাহিনীতে পরিণত করার জন্য অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে এসেছেন, সেই তাহের আজ মৃত্যুর মুখোমুখীহয়তো প্রহসনের বিচারে তাঁর মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবেকিন্তু এই মৃত্যুর জন্য কে হবে দায়ী? বিনুর কাছে এর উত্তর জানা নেইপার্টি সমন্বয় কমিটির বৈঠকে পার্টি লাইন ও রণকৌশল নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক হয় আত্মসমালোচনার মধ্যদিয়ে উঠে আসে নানান প্রশ্ন

অনেক সময় পেরিয়ে গেছেঘড়ি দেখলো বিনুহ্যাঁ, আর ১৫/২০ মিনিটের মধ্যেই ঘাটে পৌঁছে যাবে লঞ্চ বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে ভাবতে ভাবতে খুব সহজেই সময় কেটে গেছেঢাকায় সিওসি এবং পলিটব্যুরো নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর পার্টি-এলাকায় পৌঁছে এবার বিনু আরো কঠিন উদ্যোমে কাজ করবেমনে মনে শপথ নিলো বিনুযে কোন মূল্যেই হোক দেশে বিপ¬ব ঘটাতে হবেপাল্টে ফেলতেই হবে সমাজকেনা হলে শুধু বিনু বা বিনুর মতো বর্তমান সমাজের মানুষগুলোই নয়, তাদের প্রজন্মও দাসত্বের এক নিগূঢ় শৃঙ্খলে আটকে পড়বেব্যহত হবে তাদের স্বাভাবিক বিকাশতারা পরিণত হবে পঙ্কিল সমাজের নোংরা জীবেসমাজটা হয়ে উঠবে আরো বিষময়, আরো অমানবিকএটা মেনে নেওয়া যায় নাএর বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম চালাতেই হবে

এবার এলাকায় ফিরে রিতুর সঙ্গে দেখা করবে বিনু অনেকদিন হলো দেখা করতে পারেনিকেমন আছে ভাল করে খোঁজও নিতে পারেনিঅথচ রিতু সব সময় খোঁজ রেখেছেবিনুর জীবনে এটা একটা অস্বাভাবিক ঘটনাপার্টি জীবনে প্রেমটা স্বাভাবিক নয়কারণ জীবনটা সব সময় ঝুঁকিপূর্ণযে কোন সময় মারা যেতে পারেপারে গ্রেফতার হতে গ্রেফতার হলে কি পরিণতি হবে সেটা পরিস্কারআর একটা ব্যাপার হলো পার্টি শৃঙ্খলার স্বার্থে কোন ঘটনা গোপন রাখা নিষিদ্ধকারণ পার্টিজীবনে পার্টিই সব বাবা-মা-ভাই-বোন বা আত্মীয়-স্বজনের চাইতেও বেশি বিশ্বাসযোগ্য হলো পার্টি পার্টির কাছে তাই কোন কিছু  গোপন রাখা চলবে নাএরকম গোপন রাখার পরিণাম হতে পারে চরমএকবার এক পার্টি কমরেড একটি সেল্টারে গিয়ে প্রেম করার চেষ্টা করেছিল সেই বাড়ির মেয়ের সঙ্গে ব্যাপারটি সে পার্টিকে জানায়নিপরে জানাজানি হয়ে গেলে কমরেডটির শাস্তি হয়েছিল মৃত্যুদণ্ডসুতরাং পার্টি-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করার কোন উপায় নেইযেমন উপায় নেই পার্টি ত্যাগ করারসে চেষ্টা করার শাস্তিও ফায়ারিং স্কোয়াড

রিতুর ব্যাপারটা বিনু পার্টিকে জানায়নিএ জন্য বিনুর মনে কোন অপরাধবোধ নেইকারণ পার্টি কখনও ওর ব্যক্তিগত বিষয়ে জানতে চায়নি, প্রশ্নও তোলেনিপ্রশ্ন তুললে বা জানতে চাইলে অবশ্যই বিনু সব জানাতোসুতরাং ব্যাপারটা গোপন থাকার যৌক্তিকতা রয়ে গেছেবিনু সিদ্ধান্ত নিলো ঢাকা থেকে ফিরেই রিতুর সঙ্গে দেখা করবে

---- চলবে ----


আবুল হোসেন খোকন : লেখক-সাংবাদিক, কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী।