উপাসনা ধর্ম বনাম মানব ধর্ম

মাসুদ রানা

(১ম কিস্তি )

প্রকৃত শুদ্ধ জীবন যাপন কষ্টকর হলেও একেবারে অসম্ভব নয়। চেষ্টা করলেই পারা যায় একটি সুস্থ -সুন্দর ও আনন্দময় জীবন যাপন। সামাজিক ভাবে যে কোনো অবস্থা সম্পন্ন ব্যক্তি মাত্রই, তার চারপাশে এক দুর্লংঘ প্রাচীর তৈরী করে, গড়ে নিতে পারে একটি নিজস্ব ভূবন। যেখানে থাকবে তার একচ্ছত্র আধিপত্য। যেখানে মুক্ত চিন্তায় বাধা থাকবেনা, কুসংস্কার থাকবেনা। নিজস্ব  বোধে বা আমিত্বে অসীম বা ইনফিনিটিকে ধারন করবে। মানুষের মস্তিস্কের যে সীমাহীন ক্ষমতা; তার নিজস্ব পরিমন্ডলে এর যত টুকু প্রভাব পড়ে, তা মুলতঃ প্রাগৈতিহাসিক জিনেটিক কোডে পরিবাহিত হয়ে, কালে কালে তার কেন্দ্র নির্দেশ করে মাত্র। সৃষ্টিপুর্ব সমস্ত কেন্দ্রিভুত শক্তি স্থিত রয়েছে, সৃষ্টিউত্তর প্রতিটি বস্তু কনার অভ্যন্তরে। বস্তু কনার ক্ষুদ্রতম বিভাজনে যেমন সে শক্তি বেরিয়ে আসে-তেমনি মানুষের নিওরোনে সঞ্চিত অমিততেজা বৈপ্লবিক চিন্তাশক্তি, পারিপ্বার্শিকতার সাপেক্ষে, সুষ্ঠ ‍জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে মুক্তকচ্ছ হয়ে বেরিয়ে আসে। বিবর্তনের প্রতিটি পর্যায়ে সংগৃহীত জ্ঞান আপটুডেট হয়ে আজ মানুষ এক প্রচন্ড ক্ষমতাশালী মস্তিষ্কের অধিকারী। এর ক্ষমতার সবটুকু আমরা জানিনা, তবে যতটুকু নমুনা আমরা দেখছি, তাতেই বিস্ময়ে আমরা হতবাক হয়ে যাচ্ছি। দিনে দিনে মানুষ তার ক্ষমতার সীমা বাড়িয়ে আরো শক্তিশালী ও পরিশীলিত উপায়ে, সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রসারমান মহাবিশ্বের সমান্তরালে। মানুষের নিত্য নতুন আবিষ্কার এবং তার সৃষ্টির পেছনে মূল নিয়ামক হচ্ছে তার অসাধারন কল্পনা শক্তি। মানুষের কল্পনা শক্তি এই মহাবিশ্বের মতই অসীম। কাজেই বলা যায় যে, মানুষ তার নিজের ভেতর অসীম কে ধারন করছে। যদিও এখনো মানুষের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে; যে গুলো ভবিষ্যতে থাকবেনা। সেই সব সীমাবদ্ধতাই মানুষ কে পরমেশ্বর নিয়ে ভাবায়। মানব সভ্যতার ঊষালগ্নে অসহায় মানুষ নানা প্রতিকুল পরিবেশে ক্ষমতাশালী  সৃষ্টি কর্তার কল্পনা করেছে তার প্রচন্ড কল্পনাশক্তি দিয়ে। রহস্যময় সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ত প্রমান করার চেষ্টা করেছে, তার বিশ্বাস থেকে উদ্ভুত নানা যুক্তি দিয়ে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিস্মিত, ভয়ার্ত মানুষ কল্পিত সৃষ্টিকর্তার তুষ্টি লাভে তৈরী করে বিভিন্ন ধরনের উপাসনা পদ্ধতি। স্বীয় কল্পনায় ফারাক থাকার কারনে এক ধর্মের লোকের সাথে অন্য ধর্মের লোকের বিভেদ তৈরী হয়। কালে কালে সেগুলো মানুষের সমাজ, সংসার এবং সভ্যতার সাথে বিবর্তিত হতে হতে আজ পৃথিবীর ছয় বিলিওন মানুষ কে বিভক্ত করে দিয়েছে। চক্ষুষ্মান কেউ এই বিভক্তি দেখলেই আনুষ্ঠানিক ধর্মের অসারতা বুঝতে পারবে। এবার ধর্ম প্রচারকদের নিয়ে একটু বলি। সব দেশের সব সমাজেই কিছু মানুষ থাকে, যারা একটু অন্য রকম, ভাবুক প্রকৃতির। তাদের মনোজগত সাধারণ মানুষের মত নয়। চেতন মন এবং অবচেতন মনের মাঝামাঝি একটি স্টেজে এদের বসবাস। সাধারন মানুষের চেয়ে এদের বুদ্ধিমত্তা সচরাচর বেশীই থাকে। এরা মানব সমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামায় এবং প্রতিকারের পথ খোঁজে। ধর্মপ্রচারক গন এ ধরনের মানুষ ছিলেন। বৈজ্ঞানিক ভাবে অনগ্রসর থাকার কারনে যদিও তাদের উদ্ভাবিত ধর্ম গুলো আজকের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে অচল হয়ে গেছে। তবুও একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে তাদের উদ্দেশ্য মহ ছিলো। কিন্তু সত্যিকারের কোনো ঈশ্বরের হাত না থাকায়, তাদের প্রচারিত মতবাদ গুলোয় ফারাক রয়ে গেছে। সে যাই হোক, সুখের বিষয় এই যে, এসব মহাপুরুষদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো মানুষের কল্যাণ। প্রত্যেকটি ধর্মেই তাই জীবে প্রেম, অহিংসা, স কর্ম এই ব্যাপার গুলো এসেছে।তাদের অনুগামীগন যদিও মূল সুরটি ধরতে পারেনি। তাই ধর্মের নামে পৃথিবীতে এত অত্যাচার হয়েছে এবং আজকের এই সুসভ্য সমাজে এখনও হচ্ছে। যে কারনে আনুষ্ঠানিক ধর্মগুলো সংস্কার এখন অতীব জরুরী হয়ে গেছে।  ধর্ম সম্মানযোগ্য এবং অনুকরনযোগ্য হতে পারে, যদি তা মানবতার বিপক্ষে না যায়। কোনো ধর্ম যদি মানুষকে সুসভ্য, শিক্ষিত, এবং  জ্ঞানী করে তোলে, তবে সে ধর্ম অবশ্যই পালণীয়। আর কোনো ধর্ম যদি মানুষ কে, সাম্প্রদায়িক মনোভাবে দীক্ষিত করে, আচারের নামে কুসংস্কারে বিশ্বাস করতে বলে এবং সমাজে বিভক্তি তৈরী করে, তবে সে ধর্ম অবশ্যই বর্জনীয়। সকল ধর্মের স্রষ্টাগন তাদের সময়ের যুগোপযোগী মতবাদ প্রচার করেছেন।  আসলে এতগুলো ধর্ম সৃষ্টির পেছনে আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

 

                                                                                                ( চলবে )