বাসুনকে, মা
লুনা শীরিন
পর্ব ৪

বাসুন,
কেমন নীরব হয়ে ঘুমিয়ে আছিস তুই - অপুর্ব আলোয় ঝলমলে একটা ভোর।এরকম ভোরবেলা দেখলেই আমার রংপুরে নানাবাড়ির কথা মনে পড়ে, আমি তখন ফোর/ফাইভে পড়ি আমরা চারবোন ও মা থাকতাম রংপুরের আলমনগর নামে একটি এলাকায় । ঠিক গ্রাম ও না, আবার শহরও না,বলতে পারিস প্রায় শহর হয়ে আসা একটি এলাকা । তোর নানাভাই সেই সময় দেশের বাইরে পড়তে গিয়েছিলেন বলেই আমরা পাচবছর নানাবাড়িতে ছিলাম। তোর নানীআপু ছিলেন আমার নানাবাড়ির বড়মেয়ে এছাড়াও আমার নানা শিক্ষিত চাকরিজীবি ছেলের সাথে মেয়ে বিয়ে দিয়ে মেয়েকে শহরমুখি রাখতে চান বলেই বড়মেয়েকে সারাজীবনই নানানভাবে সহযোগীতা করেছেন । আমি বড় হবার সাথে সাথে বুঝতে পেরেছিলাম, বাংগালী মধ্যবিত্তের জীবনে এটি একটি সাধারন ঘটনা । কারন আমি তোকে যে সময়ের কথা বলছি তখন শিক্ষিত মানুষ বলতে সত্যিকার সৎ মানুষই বোঝাতো যাদের সমাজে কদরও ছিলো।আজকে আমাদের সমাজে যে সচেতন শিক্ষিত দুষ্ট মানুষকে সচারচর দেখতে পাই তাদের বথা বলছি না রে বাসুন। যা হোক তোকে যা বলছিলাম ,সেই নানাবাড়িন দিনগুলো আমার কাছে এখনো সবচেয়ে সুন্দর সময় ,আমি প্রতিদিন ভোরবেলা উঠে নানীর সাথে হাটতে যেতাম ,আর সেই যে আমার ভিতরে মাটি ও মানুষের কাছাকাছি থাকার একটা প্রবনতা দাড়িযে গেছে আমি আজ পর্যন্ত সেখান থেকে বের হতে পারলাম না।
এই প্রসংগেই অন্য একটা জীবনের কথা বলি তোকে, তার আগে তোকে অন্য কিছু কথা বলে রাখি । তোর মায়ের জন্ম হয়েছিলো খুব সাধারন মধ্যবিত্ত এক কলেজ শিক্ষকের ঘরে এবং তারও পুর্বপুরুষ যদি বিবেচনায় আনিস, তাহলে পাবি কৃষক। বাংলাদেশের একদম ক্ষেতখামারে কাজ করা যে প্রজন্ম তেমনি এক পরিবারে বড় হয়েছিলেন তোর আজকের এই শিক্ষিত নানাভাই।সেই সুত্র ধরেই আলোর মুখ দেখেছিলো তোর মা, তাই ৮ বছর বয়সে তুই যেমন কানাডায় এসছিস উন্নত জীবনের আশায় তেমনি আমার বাবা বিদেশে পাচবছর পড়াশোনা শেষে আমাদের কে নিয়ে ঢাকায় আসেন উন্নত জীবনের স্বপ্নে। তুই যেই বয়সে টরোন্টো শহর দেখছিস আমি ঠিক সেই বয়সে ঢাকা শহর দেখেছিলাম । জন্ম ইতিহাস বিবেচনায়, তোর মা ঠিক দুই প্রজন্ম কে ডিংগিয়ে গেছে কারন তোর নানাভাই এর অনান্য যারা মফস্বল এর কলেজ শিক্ষক সহকর্মীরা আছেন তাদের ছেলেমেয়েরা অনেকেই খুব মনোযোগ দিয়ে সংসার করছে,এই টরোন্টো শহরে তোর মায়ের মতো তোকে নিয়ে যুদ্ব করার কথা তাদের স্বপ্নেও আসবে না কখনো। জানিস সোনা ,আমার এই ৩৭ বছরের জীবনটাও খুব সহজভাবে আসেনি বা বলতে পারিস এই জীবনটা আমার প্রাপ্য ছিলো না বরং এই জীবনটা যাপন করবো বলে তোকে নিয়ে তোর মায়ের প্রস্ততি ছিলো মোট ৫ বছরের। সেখানে হেরে যাওয়া আছে, অসংখ্য বাধা আছে এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা তো পদে পদে আছেই-- তবু তোর মায়ের ধৈর্ষ ছিলো বাসুন। কেমন করে এতদুর এলাম আমি ? এই বিদেশ বিভুই এ আমি আছি আর আছিস তুই , ভয় কি সোনা ? জয়ী আমাদের হতেই হবে বাবু , তোর মুখ চেয়ে জীবনটাকে আরো একবার দেখে নিতে চাই বাসুন। তোকে একটা গল্প বলতে চেয়েছিলাম, দেখি অন্য একদিন বলবো।

আদর,
তোর মা ।
১৮ জুলাই, ২০০৭
                                                                                             Email:[email protected]

পর্ব                                                                                  পর্ব